3.7 C
New York
Tuesday, March 9, 2021

ভ্যাকসিন ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

 এ ম সি (রোমেল) প্যারিস, ফ্রান্স থেকে

ভারতের কাছ থেকে উপহার হিসেবে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ২০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন চলে এসেছে বাংলাদেশে। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ২০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন ভারত সরকার নিজের টাকায় কিনে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট এর কাছ থেকে একই ভ্যাকসিনের আরও তিন কোটি ডোজ কিনেছে বাংলাদেশ। আগামী ২৫ জানুয়ারি এই ভ্যাকসিনের প্রথম চালান বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে। আর এই ভ্যাকসিন প্রয়োগ ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ! ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থকরা প্রতিবেশী দেশ ভারতের ২০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন উপহার -কে উল্লেখ করেছেন ‘বন্ধুত্বের স্মারক’ হিসেবে। এই উপহারকে ভারতের সাথে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের যে ঐতিহাসিক হৃদ্যতা কিংবা সুসম্পর্ক সেটির সর্বশেষ ‘সফল কূটনীতি’ হিসেবেও কেউ কেউ উচ্চারণ করছেন। ভ্যাকসিন কূটনীতি’র অংশ হিসেবে ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিনা পয়সায় করোনাভাইরাসের টিকা পাঠানোর যে কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, তার আওতায় গত বুধবার ভুটান ও মালদ্বীপে কয়েক লাখ ডোজ ‘কোভিশিল্ড’ পাঠানো হয়েছে। ভারত থেকে বর্তমান সরকারের ভ্যাকসিন আমদানি নিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নানামুখী আলোচনা বেশ কিছু দিন ধরেই চলে আসছিল। ‘ উপহার’ হিসেবে ২০ লাখ ডোজ আসার পরে ভ্যাকসিন পলিটিক্সে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। এর ফলে জনগণের মধ্যে ভ্যাকসিন গ্রহণ করা নিয়ে একধরনের ‘আস্থা-অনাস্থার’ চিত্র ফুটে উঠছে। পাশাপাশি কিন্তু ভ্যাকসিন গ্রহণের পর যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরির আশঙ্কা থাকে, সেটি নিয়ে জনমনে একধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ এটিকে আস্থাহীনতা হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। ভারতে ভ্যাকসিন গ্রহণের পর অনেকের অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর মিডিয়াতে আসায় সেটি নিয়েও আলোচনা-সমালোচনা বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে । ভারতের বায়োটেকের উদ্ভাবিত আরেকটি ভ্যাকসিন ‘কোভ্যাকসিন’ নিতে সেখানকার চিকিৎসকদের একটি অংশ অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে বাংলাদেশে যে ভ্যাকসিন উপহার দেয়া হয়েছে, সেটিকে সরকার অক্সফোর্ড এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন ‘কোভিশিল্ড’ বলে ইতোমধ্যে জানিয়েছে। গত ৩০ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্য প্রথম অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনার টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা সাধারণ রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করা যায়। এই টিকার দুটি করে ডোজ নিতে হয়। দুই ডোজের মধ্যে ব্যবধান চার সপ্তাহ। এদিকে গত বৃহস্পতিবার ভ্যাকসিন হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে টিকা দেয়ার জন্য ভারত সরকারকে ধন্যবাদ জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। ভ্যাকসিন দেয়া নিয়ে বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে কোনও গুজব না ছড়ানোর জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভ্যাকসিন মানুষের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ। যারা মানুষের জীবন নিয়ে ষড়যন্ত্র, রাজনীতি করে তারা সঠিক লোক নয়। আমরা করোনা মোকাবেলায় আছি, জীবন রক্ষায় আছি। এই মোকাবেলায় ভ্যাকসিন একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। এজন্য কেউ যাতে জাতিকে বিভ্রান্ত না করে সেজন্য সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছি। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক নতুন সম্পর্কের ভিত গড়ে দিতে পারে, যদি তা সৃজনশীল ও ভবিষ্যত্মুখী ভাবনা ও নীতি-কাঠামোর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। সে ক্ষেত্রে অতীত ও বর্তমান যেমন উপস্থিত থাকবে, তার চেয়ে বড় আহ্বান নিয়ে দাঁড়াবে ভবিষ্যৎ, ভবিষ্যতের মানুষ। ভারতের দিক থেকে বাংলাদেশ সাম্প্রতিক কালে তিনটি বিষয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় দৃশ্যত তার প্রভাববলয় বিস্তার করতে বরাবর আগ্রহী হলেও ভারতের নেতাদের ও বিশ্লেষকদের ধারণা, তাঁদের নিজস্ব অর্থনৈতিক বিকাশ এবং বহির্বিশ্বে তাঁদের স্বীকৃতি তেমন পরিস্থিতিকে আরও সহজ করে তুলেছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এই কাজে সম্পূরক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে তাঁরা মনে করেন। এটি তাঁদের আঞ্চলিক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার অংশও বটে। এর আগে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে ‘স্বামী-স্ত্রীর মতো’ বলে অভিহিত করেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘আজকাল’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একথা বলেছিলেন তিনি। ভারত কৈয়ের তেলে কৈ ভাজার বিষয়টি বেশ ভালভাবেই জানে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। ঋণ দিয়ে ঋণের পুরো সুবিধা কিভাবে তুলে নিতে হয়, তা সে ভাল জানে। ভারতের মিডিয়া ও বাংলাদেশের বিশ্লেষকদের বিশ্লেষনে বুঝতে অসুবিধা হয় না, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের লেনদেনের যে সম্পর্ক তা কেবল ভারতকে দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এটা একতরফা এবং অসম সম্পর্ক। এর জন্য ভারত যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায় আমাদের রাষ্ট্র পরিচালকদের। কারণ তারা আমাদের ন্যায্য পাওনা বুঝে নিতে পারেনি বা পারছে না। নিজের বুঝ যে বুঝে নিতে পারে না, অন্যে তা নিয়ে নেবে, এটাই জগতের নিয়ম। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, বাংলাদেশের কাছে ভারতের চাইতে দেরি হয়, দিতে দেরি হয় না। যেমন বন্দর ব্যবহারের কথা ভারত বলতে না বলতেই চট্টগ্রামে ভারতীয় পণ্যবাহী জাহাজের ব্যবহার শুরু হয়ে যায়। বন্দর ব্যবহারের পর এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর আগে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভারতের পূর্বাঞ্চলে খাদ্য সরবরাহের জন্য ভারত মানবিক সহায়তা চাওয়ার সাথে সাথে বন্দর ব্যবহারের সুবিধা দেয়া হয় । ভারতের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ অসামান্য ভূমিকা পালন করে চলেছে। অর্থাৎ ভারতের যা যা প্রয়োজন বাংলাদেশ তাই দিয়েছে এবং দিচ্ছে। ফলে জনসাধারণের মনে যদি প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশ কি পেল? এ প্রশ্নের উত্তর শুধু, আশ্বাস আর আশ্বাস। এক স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন করতে ভারত সময় নিয়েছে ৪১ বছর। বাংলাদেশের জীবনমরণ সমস্যা ন্যায্য পানি প্রাপ্তির সমাধান হতে কত বছর লাগবে, তা কেউ বলতে পারবে না। দেখা যাবে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে যাচ্ছে, পানি সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। অনেকে বলতে পারেন, চুক্তি হওয়া স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হতেই ৪১ বছর লেগেছে। ভারতের জনগণের সাথে বাংলাদেশের জনগণের কি কোন শত্রæতা আছে? এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া মুশকিল। যদি শত্রæতা থাকে বলে ধরে নেয়া হয়, তাহলে কেন এই শত্রæতা, এ প্রশ্নের জবাব খোঁজা জরুরি। ভারত বা বাংলাদেশের মানুষ যদি দেখে এক দেশ আরেক দেশের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে, তবে বঞ্চিত দেশের যে কোন নাগরিকের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হবেই। ভারত যদি বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকারগুলো যৌক্তিকভাবে সমাধান করে দেয়, তাহলে তো এ দেশের মানুষের মধ্যে ভারতবিরোধী কোন মনোভাব থাকার কথা নয়। বরং দুই দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বের স্রোতধারা বয়ে যাওয়ার কথা। ভারতের কেবল নিয়েই যাব, দেব না কিছুই-এই নীতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে তাকে বন্ধু বলে ভাবার কারণ থাকতে পারে না। বিশেষ করে যখন স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলে, তখন ভারতকে জনগণ বন্ধু হিসেবে নেয়ার প্রশ্ন উঠে না। আমাদের দেশের জনগণকেও ভারতের এ মনোভাব সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। বিষয়টি সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকেও বুঝতে হবে। ক্ষমতায় থাকা বা যাওয়ার স্বার্থে নয়, দেশের স্বার্থে তাদেরকে রজনীতি করতে হবে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অতি সাধারণ একটি প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা যে ভারতের চাহিদা মতো সবকিছু দিলাম, আমরা কী পেলাম? আমাদের চাওয়া তো খুব বেশি কিছু ছিল না। শুধু নদ-নদীর ন্যায্য পানির হিস্যাটুকু পাওয়া। নিদেন পক্ষে তিস্তা চুক্তিটি সম্পন্ন করা। এই একটি চুক্তি কি ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে করেছে? করেনি। উল্টো নানা টালবাহানা করে হবে, হচ্ছে বলে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সরকার কেবল ভারতের মুখ থেকে ‘গভীর বন্ধুত্বে’র কথা শুনেই আনন্দে আছে। তার আচরণে মনে হচ্ছে, ভারত যদি আরও কিছু চায়, তা দিতে, বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না।

Related Articles

টিকটক ভিডিও তৈরিতে বাধা দেয়ায় স্বামীকে হত্যা করে মিতু

টিকটক ও লাইকির ভিডিও করতে বাধা দেয়ায় স্কুলশিক্ষক নাসির উদ্দিনকে হত্যা করে স্ত্রী মিতু ও তার কথিত প্রেমিক রাজু। হত্যার নয় মাস পর কথোপকথনের...

ভ্যাকসিন ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

 এ ম সি (রোমেল) প্যারিস, ফ্রান্স থেকে ভারতের কাছ থেকে উপহার হিসেবে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ২০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন চলে এসেছে বাংলাদেশে। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ২০ লাখ ডোজ...

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা দিবসে ইতালিতে দোয়া মাহফিল

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা দিবসে ইতালি আওয়ামী লীগের আয়োজনে রোমের একটি মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়েছে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল। দোয়ার আগে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

11 − 7 =

Stay Connected

20,822FansLike
2,508FollowersFollow
0SubscribersSubscribe

সাম্প্রতিক পোস্ট

টিকটক ভিডিও তৈরিতে বাধা দেয়ায় স্বামীকে হত্যা করে মিতু

0
টিকটক ও লাইকির ভিডিও করতে বাধা দেয়ায় স্কুলশিক্ষক নাসির উদ্দিনকে হত্যা করে স্ত্রী মিতু ও তার কথিত প্রেমিক রাজু। হত্যার নয় মাস পর কথোপকথনের...

ভ্যাকসিন ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

0
 এ ম সি (রোমেল) প্যারিস, ফ্রান্স থেকে ভারতের কাছ থেকে উপহার হিসেবে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ২০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন চলে এসেছে বাংলাদেশে। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ২০ লাখ ডোজ...

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা দিবসে ইতালিতে দোয়া মাহফিল

0
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা দিবসে ইতালি আওয়ামী লীগের আয়োজনে রোমের একটি মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়েছে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল। দোয়ার আগে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব...

ইতালির রোমে করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশির মৃত্যু

0
ইতালির রোমে করোনায় আক্রান্ত হয়ে রুবেল হোসেন নামে এক বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। প্রায় তিন সপ্তাহ করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। রোমের জেমেল্লি হাসপাতালে...

স্পেনে করোনায় আরেক বাংলাদেশির মৃত্যু

0
স্পেনে মহামারি করোনা ভাইরাসে আরেক বাংলাদেশি মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত ব্যক্তির নাম হারুন উর রশিদ, বয়স ৫৭। ২৪ আগস্ট সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সেভিয়ার স্থানীয়...